বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি বলতে একটাই সংখ্যা নেই। একেক খাতের জন্য আলাদাভাবে ঠিক করা হারের একটা জটিল হিসাব আছে। আর এখানে ভুল করাটাই বাড়তে থাকা একটা ব্যবসার আইনি ঝামেলায় পড়ার সবচেয়ে সহজ পথ। পুরো ব্যবস্থাটা আসলে কীভাবে চলে, সেটাই এখানে বলছি।
কেন কোনো একক ন্যূনতম মজুরি নেই
বাংলাদেশে সবার জন্য একটা জাতীয় হার ঠিক না করে খাত ধরে ধরে মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করা হয়। পোশাক, চামড়া, চা বাগানসহ বড় শিল্পগুলোর প্রতিটার নিজস্ব বোর্ড আছে, যারা সময়ে সময়ে বসে সেই খাতের ন্যূনতম বেতন ঠিক করে দেয়। মানে আপনার ব্যবসার জন্য কোন হারটা প্রযোজ্য তা পুরোপুরি নির্ভর করে আপনি কোন শিল্পে আছেন তার ওপর। একটা সংখ্যা সবার জন্য খাটবে, এমন সহজ কোনো পথ এখানে নেই।
মজুরি বোর্ড আসলে কীভাবে হার ঠিক করে
মজুরি বোর্ডে সাধারণত শ্রমিক, মালিক আর সরকারের প্রতিনিধিরা থাকেন। তারা প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে না, বরং সময়ে সময়ে বসে বেতন পর্যালোচনা করেন। বোর্ড বসে নতুন হারে একমত হলে তবেই সেটা সংশোধন হয়, আর দুই দফার মাঝখানে কয়েক বছরও পেরিয়ে যেতে পারে। ঠিক এ কারণেই গত বছর বা তারও আগে কোথাও দেখা একটা সংখ্যা তুলে নিয়ে কাজ চালানো ঝুঁকির কাজ। পুরনো সংখ্যার ওপর ভরসা না করে আপনার খাতের এখনকার গেজেটেড হারটা দেখে নিন।
ন্যূনতম মজুরিতে আসলে কী কী গণ্য হয়
ন্যূনতম মজুরির অঙ্কটা সবসময় শুধু মূল বেতন না। খাত অনুযায়ী গেজেটে দেওয়া ন্যূনতম মজুরি মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা আর অন্যান্য অংশে ভাগ করা থাকতে পারে, আর প্রতিটার জন্য নির্দিষ্ট অঙ্ক বলা থাকে। মোট টাকাটা ঠিক রাখা আর সেই টাকাটা ঠিকভাবে ভাগ করে দেওয়া, দুটো এক জিনিস না। কারণ কিছু ভাতার হিসাব কীভাবে করতে হবে, তার আলাদা নিয়ম আছে। মূল বেতন আর ভাতার এই একই ভাগাভাগির ওপর নির্ভর করে বেতনে কত আয়কর বসবে তা-ও, তাই কাঠামোটা শুরু থেকে ঠিক রাখলে দুই দিক থেকেই ঝামেলা এড়ানো যায়।
বাড়তে থাকা কোম্পানিগুলো কেন এখানে আটকে যায়
এক খাতে ব্যবসা শুরু করে পরে আশপাশের কাজে ছড়িয়ে পড়লে একাধিক মজুরি বোর্ডের নিয়ম মিলিয়ে দেখতে হতে পারে। কোম্পানিগুলো অনেক সময় ভাবে, তারা যেহেতু সব মিলিয়ে ন্যূনতম মজুরির চেয়ে অনেক বেশিই দিচ্ছে, তাই কোন খাতে কত ভাগ হলো তা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে। বাস্তবে সেটা চলে না, বিশেষ করে কখনো শ্রম পরিদর্শন হলে বা কেউ প্রশ্ন তুললে।
এটা ভুল করার আসল খরচ
প্রযোজ্য ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম দেওয়াটা নিছক পেরোলের ভুল না, এটা শ্রম আইনের লঙ্ঘন। এতে কোম্পানি সত্যিকারের ঝুঁকিতে পড়ে, ব্যাপারটা শুধু একটা বিব্রতকর সংশোধনে থেমে থাকে না। তাই বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার আগে নিজের খাতের এখনকার গেজেটেড হারটা দেখে নেওয়ার জন্য দশ মিনিট সময় দেওয়াই যায়।
বড় হওয়ার সাথে সাথে হিসাব রাখা
একাধিক পদ, খাত বা এলাকা জুড়ে আলাদা আলাদা বেতন কাঠামো থাকলে প্রতিটা কর্মীর বেতন প্রযোজ্য ন্যূনতমের সাথে মিলিয়ে রাখাটা একবারের কাজ থাকে না, এটা নিয়মিত রেকর্ড রাখার কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
তাই শুরু থেকেই বিষয়টা পেরোল ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখা ভালো। শ্রম পরিদর্শক এসে প্রশ্ন করার পর হুড়োহুড়ি করে অডিট করার চেয়ে সেটা অনেক ভালো। বেতন কাঠামো কীভাবে রাখা হয় তা আছে পেরোল সফটওয়্যার পেজে, আর বড় কারখানায় মজুরি বোর্ডের হার সামলাতে হলে পোশাক শিল্পের জন্য এইচআর সফটওয়্যার পেজটা দেখুন।
আরেকটা কথা
বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরির ব্যবস্থাটা কাঠামোগতভাবে কীভাবে চলে, এই লেখায় সেটাই বোঝানো হয়েছে। ইচ্ছা করেই এখানে কোনো খাতের নির্দিষ্ট মজুরির অঙ্ক দেওয়া হয়নি, কারণ সেগুলো আলাদা আলাদা মজুরি বোর্ড ঠিক করে আর অনিয়মিত সময়ে সংশোধন হয়। তাই আপনার খাতের এখনকার গেজেটেড হারটা সংশ্লিষ্ট মজুরি বোর্ড বা একজন শ্রম আইন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নিন।
